নীরেশ ভৌমিক : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, আর গ্রন্থাগার হলো সেই বন্ধুদের মিলনমেলা, যেখানে মানুষের মন জ্ঞান ও চিন্তার আলোয় সমৃদ্ধ হয়।

” সিদনি শেলডন (Sidney Sheldon) এর মতে, “লাইব্রেরি হলো এমন একটি স্থান যা কল্পনাশক্তিকে জ্বালানি দেয়, পৃথিবীকে দেখার জানালা খুলে দেয় এবং জীবনকে উন্নত করতে অনুপ্রাণিত করে।

” শাশ্বত এই উপলব্ধিকে মান্যতা দিয়ে গত ২রা মার্চ বহু জ্ঞানী গুণী মানুষের উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হলো উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গাইঘাটা থানার গাজনা গ্রামে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা- ‘কিশলয় তরুণতীর্থ’ পরিচালিত ‘নীরজবালা সার্বজনীন গ্রন্থাগার’ এর ।

বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সমাজসেবী ডঃ অরূপ কুমার সেনগুপ্ত এর পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই গ্রন্থাগারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন মঞ্চে তিনি ও তাঁর সহধর্মিনী সুস্মিতা সেনগুপ্ত উপস্থিত ছিলেন। ফিতে কেটে এবং প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে উদ্বোধন করার পর ডঃ সেন গুপ্ত বলেন- “এই গ্রন্থাগারটি সার্বজনীন অর্থাৎ সর্বসাধারণের ।

কিশলয় তরুণতীর্থ প্রাঙ্গনে অবস্থিত হলেও এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। এটি ব্যবহারের জন্য এবং এর উন্নতির জন্য সকলেই, এমনকি অন্য প্রতিষ্ঠান ও এর মালিক।” তিনি আরো বলেন- “বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্ম হলো শিক্ষা।

একজন শিক্ষিত ব্যক্তি কখনো পিছিয়ে থাকে না।” এই মহতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডঃ সেনগুপ্তর সহপাঠী ও বন্ধুরাও। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- তিলক বসু, দীপক পাল, যতীন্দ্র নারায়ন দত্ত।

উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষক ডক্টর নিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, তরুণতীর্থ এর রাজ্য সভাপতি- শিক্ষারত্ন অমল নায়েক, প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক -সুবোধ ভৌমিক, গগন নস্কর, বর্তমান রাজ্য সম্পাদক ভাস্কর বসু, বৃহত্তর কলকাতা জেলা সম্পাদক মদন নন্দী।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষক ও সমাজকর্মী কালিপদ সরকার, শাজাহান মন্ডল, গাইঘাটা পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ মধুসূদন সিনহা, সুটিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পম্পা পাল সহ নানা বিশিষ্ট শিক্ষাদরদি ও সমাজকর্মীগণ।

অমল নায়েক উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের বার্তা দেন “পড়িলে বই, আলোকিত হই। না পড়িলে বই, অন্ধকারে রই।” কিশলয় তরুণতীর্থের সভাপতি কিশোর কুমার বেপারী তার স্বাগত ভাষণে বলেন- “এই এলাকায় আজ একটি ইতিহাস রচিত হলো।

দু হাজার বর্গফুটের বেশি জায়গা জুড়ে নির্মিত এই গ্রন্থাগার এ পুস্তকাদির সংগ্রহ সহ ডিজিটাল লাইব্রেরি ও পাঠাগারের ব্যবস্থা থাকবে। বিভিন্ন সমসাময়িক প্রসঙ্গ, জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা নিয়ে আলোচনা সভা ও সেমিনার নিয়মিত অনুষ্ঠিত হবে। যারা আসবেন তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে রিফ্রেশমেন্ট এর ব্যবস্থাও থাকবে।

“অন্যতম পরিচালক সুজিত দে বলেন- “একে তো ডিজিটাল যুগ, তার উপরে এগিয়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগান্তকারী ব্যবহার। এগুলো কি আধুনিক প্রজন্মকে ক্রমশ বইবিমুখ করে তুলছে?

এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয়েছে- কোনও একজন মানুষকে সামনে থেকে সরাসরি দেখা আর তার ছবি দেখা; এই দুটোর মধ্যে যদি কোন পার্থক্য থাকে তাহলে একটি বই এবং তার ডিজিটাল রূপের মধ্যেও সেই একই পার্থক্য। তাছাড়া প্রান্তিক বা অতি সাধারনের কাছে ঐ সমস্ত মাধ্যমগুলো সব সময় উপলব্ধ নয়।

ছাত্র অবস্থায় ডিজিটাল মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার তাদের পথভ্রষ্ট করার জন্য যথেষ্ট, এরকম একটি আতঙ্ক কাজ করছে সবার মনে। এসব ভাবনা থেকেই শিক্ষার্থী, জ্ঞানপিপাসু ও পুস্তকপ্রেমী মানুষদের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আমাদের দেশের কৃতি সন্তান, বিখ্যাত বিজ্ঞানী, আমেরিকার লে ইউনিভার্সিটির গবেষক- অধ্যাপক স্যার অরুপ কুমার সেনগুপ্ত এর প্রেরণা ও সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে এই গ্রন্থাগার। সরকারি গ্রন্থাগারের বেশিরভাগ গুলোই বন্ধ হয়ে গেছে অথবা ধুঁকছে।

এই অবস্থায় স্রোতের বিপরীত মুখে হেঁটে একটি সাহসী, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এই গ্রন্থাগার। “ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষা ও সমাজ দরদী যেসব ব্যক্তিবর্গ এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সকলেই এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

গ্রন্থাগারটির চারপাশের সুন্দর পরিবেশ ও তার নির্মাণশৈলীও চিত্তাকর্ষক। এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষজন এই উদ্যোগের মাধ্যমে এলাকায় শিক্ষা ও সাংস্কৃতির উন্নয়ন হবে, এই আশায় যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত ও খুশি।


















Leave a Reply