চড়ক পূজার রঙে-ছন্দে বাগদা : শিব-মন্দির পরিচালন কমিটির উদ্যোগে বর্ণাঢ্য রোড-শো, জনসমুদ্র বাগদা-চেঙা মহা-শশ্মান রোড জুড়ে

অনাথ সর্দার : চড়ক পূজা বাঙালির লোকাচার ও শৈব-সংস্কৃতির এক অতি প্রাচীন ঐতিহ্য। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই উৎসব জুড়ে থাকে লোকসংগীত, নৃত্য, শোভাযাত্রা ও মানুষের আবেগ-উৎসাহের মিলনমেলা।

সেই ঐতিহ্যকে আরও একধাপ এগিয়ে দিয়ে সার্বজনীন শ্রী শ্রী চড়ক পূজা উদযাপন উপলক্ষ্যে বাগদা শিব মন্দির পরিচালন কমিটি গ্রহণ করেছিল একগুচ্ছ ব্যতিক্রমী ও দৃষ্টিনন্দন কর্মসূচী।এই কর্মসূচীর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঝুমুর নাচ ও ডান্ডি নাচ।

তাল-বাদ্যের ছন্দে, লোকসুরের আবহে এবং রঙিন সাজসজ্জায় এই নৃত্যগুলো যেন মুহূর্তেই এলাকাকে উৎসবের মঞ্চে পরিণত করে। লোকসংস্কৃতির এমন প্রাণবন্ত উপস্থাপনা দর্শকদের মনে সৃষ্টি করে এক গভীর আবেগ—যেখানে ধর্মীয় ভাবনার সঙ্গে মিশে যায় মাটির গন্ধমাখা বাংলার নিজস্ব শিল্প-ঐতিহ্য।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অভিজ্ঞ শিল্পীদের একটি সুসংগঠিত দল। তাঁদের সমন্বয়ে আদিবাবা, মা কালী ও নন্দী-ভৃঙ্গীদের চরিত্ররূপ ধারণ করে শিব-পার্বতীর অনবদ্য নৃত্য পরিবেশিত হয়। এই অভিনব পরিবেশনা শুধু ধর্মীয় চিত্রকল্পই তুলে ধরেনি, বরং দর্শকদের সামনে এক জীবন্ত পৌরাণিক আবহ নির্মাণ করেছে।

শিব-পার্বতীর নৃত্যভঙ্গিমা, ঢাকের তালে তালে কালী-রূপের উন্মাদ ছন্দ, আর নন্দী-ভৃঙ্গীদের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে রোড-শো হয়ে ওঠে এক চলমান নাট্যমঞ্চ।এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দেখার জন্য বাগদা শিব মন্দির থেকে চেঙা মহা-শশ্মান পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

উৎসুক জনতা, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা—সকলেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এই অনন্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার আশায়। পুরো পথজুড়ে যেন এক উৎসব-স্রোত বয়ে যাচ্ছিল।রোড-শো’র আরও একটি উল্লেখযোগ্য ও লোকাচারসমৃদ্ধ অংশ ছিল সন্ন্যাসীদের উপস্থিতি।

শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকা সন্ন্যাসীরা চেঙা মহা-শশ্মান থেকে ‘মরার মাথা’ সংগ্রহ করে মন্দিরে ফেরেন—যা চড়ক পূজার তান্ত্রিক ও শৈব-আচারধারার এক বিশেষ প্রতীকী অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই দৃশ্য যেমন অনেকের কাছে রহস্যময়, তেমনই বহু মানুষের কাছে এটি চড়ক উৎসবের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের গভীর প্রকাশ।

সব মিলিয়ে বাগদা শিব মন্দির পরিচালন কমিটির এই উদ্যোগ এবারের চড়ক পূজাকে শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে এক বৃহৎ লোকসংস্কৃতির মিলনমেলায়।

নাচ-গান, শোভাযাত্রা, পৌরাণিক চরিত্রের অভিনয় এবং লোকাচারের অনন্য পরিবেশনা—সবকিছু মিলিয়ে বাগদার চড়ক পূজা এবারে হয়ে উঠেছে স্মরণীয়, প্রাণবন্ত ও ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ এক উৎসবচিত্র।

এই উৎসব আবারও প্রমাণ করল—বাংলার লোকউৎসব শুধুই অনুষ্ঠান নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস।উল্লেখ্য, এই সমগ্র অনুষ্ঠানকে সর্বাঙ্গীনভাবে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও প্রাণবন্ত করে তুলতে যাঁদের নিরলস পরিশ্রম, আন্তরিক সহযোগিতা

এবং নিবেদিত প্রাণ ভূমিকা ছিল, যেটা একান্তই অনস্বীকার্য—তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তিরা হলেন মধু সর্দার, অশোক সাহা, প্রনবেশ দে, কমল সর্দার, পরিমল সর্দার, দীপঙ্কর দাস, মন্টু বিশ্বাস, সঞ্জয় অধিকারী, সন্তোষ সর্দার, তাপস সর্দার, ভগীরথ সর্দার,

গঙ্গা সর্দার, পালা সর্দার, অমর সর্দার, তারক সর্দার প্রমুখ।তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উৎসব-সফল করার আপ্রাণ উদ্যোগেই অনুষ্ঠানটি দর্শকদের কাছে হয়ে উঠেছে আরও বর্ণাঢ্য, সার্থক ও স্মরণীয়।

উল্লেখ্য এদিন এই শিব মন্দিরে পদধুলি দিয়ে সর্বপ্রথম অনুষ্ঠানটিকে সমৃদ্ধ করেন বিজেপির প্রার্থী সোমা ঠাকুর, পরবর্তিতে আসেন নির্দল প্রার্থী দুলাল বর, তারপর আসেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *