নাট্যচর্চার দুই দিন: কর্মশালা ও সেমিনারে নতুন করে প্রাণ পেল গোবরডাঙার রূপান্তর

নীরেশ ভৌমিক : গোবরডাঙা রূপান্তরের উদ্যোগে ২০২৫–২০২৬ বর্ষে আয়োজিত দুই দিনের ধারাবাহিক নাট্যকর্মসূচি স্থানীয় নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করল। রূপান্তরের মহলাকক্ষ এবং বিবেকানন্দ বিদ্যামন্দিরে ২৯ ও ৩০ মার্চ ২০২৬ এই দুই দিনে অনুষ্ঠিত থিয়েটার ওয়ার্কশপ ও সেমিনার নাট্যপ্রেমী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন উদ্দীপনা। “অভিনেতার মন” নিয়ে কর্মশালায় অভিনয়ের অন্তর্গত পাঠপ্রথম দিনের থিয়েটার ওয়ার্কশপের বিষয় ছিল “অভিনেতার মন” যা নাট্যশিল্পের একেবারে কেন্দ্রে থাকা বিষয়গুলির দিকে আলোকপাত করে। কর্মশালার প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব কল্যাণব্রত ঘোষ মজুমদার।

তাঁর দক্ষ পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীরা অভিনয়ের বাহ্যিক প্রকাশ ভঙ্গির পাশাপাশি অভিনয়ের অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ পান। কর্মশালায় অভিনেতার চরিত্র নির্মাণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শরীরী ভাষার যথাযথ প্রয়োগ এবং চরিত্রের সঙ্গে মানসিকভাবে একাত্ম হওয়ার কৌশল নিয়ে বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে আলোচনা হয়। প্রাণবন্ত পরিবেশে প্রত্যেকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে এই প্রশিক্ষণকে আরও অর্থবহ করে তোলে। উপস্থিত নাট্যশিক্ষার্থীদের কাছে এই কর্মশালা যেন হয়ে ওঠে অভিনয়কে নতুনভাবে বোঝার এক বাস্তব পাঠশালা। লোকনাট্যের আধুনিক আবেদন নিয়ে আলোচনায় উঠে এল শিকড়ের কথাদ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার। বিষয় ছিল “The Contemporary Appeal of Folk Theater”—অর্থাৎ লোকনাট্যের আধুনিক আবেদন ও প্রাসঙ্গিকতা।

সেমিনারের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, রঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়। সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন, অভিক দাঁ। আলোচনায় উঠে আসে লোকনাট্যের ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক এবং আধুনিক নাট্যভাষায় লোকশৈলীর বহুমাত্রিক প্রয়োগের সম্ভাবনা। বক্তা তাঁর বিশ্লেষণে দেখান, লোকনাট্য শুধুমাত্র অতীতের সাংস্কৃতিক স্মৃতি নয়, বরং আজও মানুষের আবেগ, জীবনবোধ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি শক্তিশালী শিল্প মাধ্যম। সেমিনারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বক্তা ও উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে প্রাণবন্ত মতবিনিময়। প্রশ্নোত্তর পর্বে নানা দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে, যা আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। জ্ঞান নয়, অনুভব ও অনুপ্রেরণার মিলনমঞ্চএই দুই দিনের কর্মসূচি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা বা প্রশিক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

এটি ছিল নাট্যচর্চার এক অন্তর্গত অভিজ্ঞতা, যেখানে একদিকে অভিনয়ের ব্যবহারিক দিক স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে নাটকের শিকড় ও আধুনিক বিস্তারের সম্পর্ক নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন ভাবনার দরজা। নাট্যশিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে গোবরডাঙা রূপান্তরের এই আয়োজন স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নাট্যচর্চাকে আরও সুদৃঢ় ও সমৃদ্ধ করার পথে এই দুই দিনের কর্মশালা ও সেমিনার হয়ে উঠল এক স্মরণীয় অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *