ফাল্গুন সংক্রান্তিতে বাগদার ভবানীপুরে হ্যাঁচড়া পূজা : লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি রক্ষায় অনুপ বিশ্বাসের অনন্য উদ্যোগ

পারফেক্ট টাইম ওয়েব ডেস্ক : বসন্তের মৃদু বাতাস, বন্য-ফুলের গন্ধে ভরা গ্রামীণ প্রভাত আর সন্ধ্যায় সুরেলা কণ্ঠে ভেসে ওঠা ব্রতগান, এই আবহেই প্রত্যেক বছরের মতো এবছরও বাগদা ব্লকের ভবানীপুরে শিক্ষক ও লোকসংস্কৃতি গবেষক অনুপ বিশ্বাসের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হল ঐতিহ্যবাহী হ্যাঁচড়া পূজা।

ফাল্গুন মাসের সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত এই পূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং গ্রামীণ জীবনবোধ ও লোকবিশ্বাসের এক জীবন্ত দলিল। একটা সময় ছিল যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের তেমন প্রসারই ছিল না, ডাক্তার-ওষুধের সহজলভ্যতা ছিল স্বপ্নের মতই, তখন মানুষ বাঁচার আশ্রয় খুঁজে নিত প্রকৃতি ও দৈব-বিশ্বাসের কাছে।

বসন্তকালে পক্স, চুলকানি বা পাঁচড়ার মতো চর্মরোগ প্রায় মহামারীর রূপ নিত। সেই প্রেক্ষাপটেই গ্রামীণ সমাজে জন্ম নেয় কল্পিত দেবী ‘হ্যাঁচড়া’-র আরাধনা। বিশ্বাস ছিল, এই দেবীর কৃপায় চর্মরোগের হাত থেকে মুক্তি মিলবে। এই পূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল ব্রাত্য ফুলের ব্যবহার, যেমন- বেগুন, ঝিঙে, উচ্ছে, লাউ, লোহাগাড়া, বন্যা বা ভাঁটির ফুল।

সাধারণত সমাজের মূলধারায় অবহেলিত এই ফুলগুলিই এখানে পূজার প্রধান উপাদান, যা ছিল লোকজ সংস্কৃতির গভীর প্রতীকবাহী। ফাল্গুন মাস জুড়ে গ্রামের কুমারী মেয়েরা ভোর ও সন্ধ্যায় গান গেয়ে ব্রত পালন করে থাকে। সংক্রান্তির দিন পূজার আয়োজন হয় ঘটা করেই, কিন্তু এই পূজায় থাকে না কোনো পুরোহিত।

সম্পূর্ণ নিজস্ব লোকাচার ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয় সমস্ত আচার। দীর্ঘদিন ধরে নিজের বাড়িতেই এই পূজার আয়োজন করে আসছেন শিক্ষক অনুপ বিশ্বাস। তিনি একদিকে যেমন লোকঐতিহ্যকে জীবন্ত রেখেছেন, তেমনি প্রতি পৌষ মাসে বাস্ত পূজার আয়োজন করেও গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন।

তাঁর এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। ভবানীপুরের এই পূজার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন গ্রামের একঝাঁক মহিলাও। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- যুথিকা মণ্ডল, পদ্ম বাগচী, দীপালী বাইন, চপলা বিশ্বাস, ফুলমালা কীর্তনীয়া, নির্মলা বিশ্বাস, অমিকা বিশ্বাস, প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস, পূর্ণিমা বিশ্বাস, লিলিমা বিশ্বাস, ইন্দ্রাক্ষী বিশ্বাস, বিজলী বাগচী, রেবা বালা প্রমুখরা।

উগ্র-আধুনিকতার যুগে যখন হারিয়ে যাচ্ছে, এমন অনেক লোক-সংস্কৃতি। ঠিক তখনই ওঁনাদের সম্মিলিত উদ্যোগেই আজও বেঁচে আছে এই প্রাচীন লোক-বিশ্বাসের রঙিন পরম্পরা। ভবানীপুরে ঐতিহ্যের এই স্নিগ্ধ আয়োজন তাই আবারও মনে করিয়ে দেয়- আধুনিকতার ঢেউয়ের মাঝেও শিকড়কে আঁকড়ে ধরার প্রয়াস কতটা মূল্যবান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *