মঞ্চস্থ হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক অতি পরিচিত নাটক ‘ডাকঘর’

নীরেশ ভৌমিক : ‘ডাকঘর’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর এক অতি পরিচিত এবং বহুল মঞ্চায়িত একটি নাটক। নাটকটি নতুন রূপে ও নতুন উপস্থাপনায় মঞ্চস্থ করলো দত্তপুকুর দৃষ্টি নাট্যদল। রবীন্দ্রিকতার ছোঁয়াকে বহাল রেখেই নাটকটিকে উপস্থাপন করেছে, যা দর্শকদের অনুভবে গভীর ছাপ ফেলে।

বিষণ্ণতার আবরণে ঢাকা অমলের অসুস্থতা, ঘরবন্দি জীবন এগুলো শুধু মাত্র শারীরিক নয়, এক ধরনের অস্তিত্বগত সীমাবদ্ধতাকেই আমরা প্রত্যক্ষ করি তার মধ্য দিয়ে। সে বাইরের জগতকে জানার, ছোঁয়ার, অনুভব করার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করে।

কিন্তু যেন মৃত্যুই দিয়ে যায় তাকে মুক্তির স্বাদ। সীমাবদ্ধ মানুষ আসলে প্রতি নিয়ত খোঁজে মুক্তি।আর মৃত্যুই আসলে সব থেকে বড় মুক্তি। অনেকদিনের রুদ্ধদ্বার খুলে দমকা বাতাসের প্রবেশের মতো মৃত্যু এসে আমাদের মুক্তি দিয়ে যায় অসীম শূন্যে।

এ নাটকে অমল, তার সুদক্ষ অভিনয়ে তার করুন দুটি চোখ দিয়ে যেন সেই মুক্তি খোঁজে, আর তেমনই আমাদেরও ভাসিয়ে নিয়ে যায় তার সেই দৃষ্টিতে, যেন মুক্তির খোঁজে আমরাও তার সঙ্গী হয়ে উঠি। অভিনয়ের দিক থেকে প্রত্যেকের অভিনয় অত্যন্ত জীবন্ত এবং যথাযথ।

অমল সহ মাধব চরিত্রটি ও ঠাকুরদা চরিত্রটি নজর কাড়ে। এছাড়াও বাকি সকলে মোড়ল,কবিরাজ,প্রহরী সকলেই নিজ নিজ চরিত্রায়নে যথাযথ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সুধার সরল উচ্ছ্বাসে আমরা যেন ফুলের কোমল স্পর্শ পাই হৃদয়ে ,যা অমলের বিষণ্ণতার বিপরীতে এক নির্মল আলোর রেখা হয়ে ওঠে।

আবার অবাক করে ‘ছেলের দল’,যেখানে একদল বৃদ্ধ প্রবেশ করে তাদের শিশু-সুলভ উদ্দাম উচ্ছ্বাসে দেখিয়ে দেয়, বয়স আসলে সংখ্যা মাত্র,সবুজ তো আমরা মনে।এক বিষণ্ণতা, উচ্ছ্বাস ও সরলতার আবর্তেই নাটকটি আমাদের অন্তরে নাড়া দেয়।

এই নাটকের মঞ্চসজ্জা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দৃশ্যকল্প ও আবহে রবীন্দ্রিকতার ছোঁয়া বজায় রেখেই তা আমাদের সঙ্গে মিশে যায়। যা বিশেষ ভাবে নাটক টিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়।

আলো, পরিবেশ ও সামগ্রিক উপস্থাপনা এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দক্ষ নির্দেশনায় সবটা মিলিয়ে পুরো প্রযোজনাটি দর্শককে এক গভীর অনুভবের ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়। যেখানে বিষণ্ণতা, মুক্তি ও চিরশান্তির এক অনিবার্য দর্শন আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *