পারফেক্ট টাইম ওয়েব ডেস্ক : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে সীমান্তবর্তী বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রে। তবে এবার এই উত্তাপ শুধু রাজনৈতিক ময়দানেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ছায়া পড়েছে ঠাকুরনগরের ঐতিহ্যবাহী ঠাকুর পরিবারেও। কারণ, বাগদা বিধানসভাকে ঘিরে এবার মুখোমুখি হচ্ছেন একই পরিবারের দুই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। একজন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মধুপর্ণা ঠাকুর, অন্যজন বিজেপির প্রার্থী সোমা ঠাকুর। সম্পর্কের সূত্রে তাঁরা কাকাতো-জেঠাতো ননদ-বৌদি। ফলে এই নির্বাচনী লড়াই এখন কার্যত রূপ নিয়েছে এক পারিবারিক-রাজনৈতিক দ্বৈরথে। তৃণমূল কংগ্রেস অনেক আগেই বাগদা বিধানসভার প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভার সাংসদ মমতা ঠাকুরের কন্যা তথা বিদায়ী বিধায়ক মধুপর্ণা ঠাকুরের নাম ঘোষণা করে দেয়।

এরপর একে একে বামফ্রন্ট, কংগ্রেস, এসইউসিআই-সহ অন্যান্য দলও নিজেদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহল ছিল বিজেপির প্রার্থীকে ঘিরে। কারণ, বাগদা কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক যে নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিজেপির নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের একাংশের দাবি ছিল, প্রার্থী যেন স্থানীয় তথা ভূমিপুত্র হন। এই দাবিকে ঘিরে দলের অন্দরমহলে একাধিক নাম ঘুরপাক খেতে শুরু করে। কিন্তু সেখানেই দেখা দেয় নতুন জটিলতা। বিজেপির বিভিন্ন লবি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এই আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ড ভিন্ন পথে হাঁটল। মঙ্গলবার সকালে রাজ্যের মোট ১৩টি বিধানসভা আসনে বিজেপি যখন প্রার্থী ঘোষণা করে, তখন বাগদা কেন্দ্রের জন্য যে নাম উঠে এল, তা কার্যত রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলে দেয়।

বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয় সোমা ঠাকুরের নাম। তিনি কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা বনগাঁর বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ, এবার বাগদার লড়াই শুধুই তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, বরং ঠাকুর পরিবারের অন্দরেই এক ঐতিহাসিক মুখোমুখি সংঘর্ষ।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, জনসংযোগের দিক থেকে এখনও পর্যন্ত এগিয়ে রয়েছেন মধুপর্ণা ঠাকুর। তিনি এলাকার পুরনো বিধায়ক, দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর মা মমতা ঠাকুর রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ায় এলাকায় নিয়মিত উপস্থিতি ও যোগাযোগ বজায় রয়েছে। ফলে সাধারণ ভোটারদের এক বড় অংশের সঙ্গে তাঁদের পরিচিতি তুলনামূলকভাবে গভীর। অন্যদিকে সোমা ঠাকুর মূলত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী হিসেবে মতুয়া সমাজে পরিচিত। তবে রাজনীতির মাঠে তাঁর সরাসরি জনসংযোগ কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

তবুও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশল স্পষ্ট, মতুয়া আবেগকে কাজে লাগিয়ে, বিধানসভার বিভিন্ন জায়গাতে উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডে দুর্নীতি, স্বজনপ্রিতি, প্রধানমন্ত্রীর ঘরে ঘরে জল প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া, অনেক বাড়িতে জলের কল না পৌঁছানো, আবার কোথাও কল থাকলেও জল নেই ইত্যাদি। এছাড়াও বাগদা পর্যন্ত রেললাইন তৈরীর করার সময়পোযোগী প্রতিশ্রুতি হয়তো বদলে দিতে পারে বাগদা বিধানসভার ভোটের সমীকরণ। রাজনৈতিক অঙ্ক বলছে, বাগদায় সংখ্যালঘু ভোটের একটা বড় অংশ তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে পড়লে মধুপর্ণা ঠাকুরের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে এখানেই শেষ নয়। কারণ, শাসকদলের বিরুদ্ধে কিছুটা ক্ষোভ যদিও এটি বাংলার রাজনীতিতে নতুন নয়। উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, অনেক সময় এমন কিছু ভুল-ত্রুটি ঘটে যায় যা জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে। সেই অসন্তোষ ভোটবাক্সে প্রতিফলিত হলে, তার বড় অংশ বিজেপির দিকে চলে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এছাড়া তৃণমূলের অন্দরে বিক্ষুব্ধ অংশ যদি সক্রিয়ভাবে বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। মতুয়া ভোটারদের একাংশের সঙ্গে সেই বিক্ষুব্ধ তৃণমূল অংশ মিলিত হলে ভোটের মার্জিন কোনদিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। সব মিলিয়ে বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রে এবার তৈরি হয়েছে এক নাটকীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি। একদিকে পুরনো বিধায়ক, পরিচিত মুখ মধুপর্ণা ঠাকুর, অন্যদিকে বিজেপির নতুন চমক, ঠাকুর পরিবারেরই সদস্য সোমা ঠাকুর। আর এই দ্বৈরথকে ঘিরেই বাগদার রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই নির্বাচন যদি সত্যিই ‘হাড্ডাহাড্ডি’ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে বাগদা বিধানসভা কেন্দ্র গোটা রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এখন শুধু অপেক্ষা, ভোটারদের রায় শেষ পর্যন্ত যাবে ননদ না বৌদির দিকে ?


















Leave a Reply