পারফেক্ট টাইম ওয়েব ডেস্ক : মানুষের হৃদয়ে মানবিকতার আলো এখনও নিভে যায়নি—মহারাষ্ট্রের ব্যস্ততম শহর মুম্বাই সেই সত্যকেই আবার নতুন করে প্রমাণ করল। দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও তৎপরতার এক অনন্য নজির স্থাপন করে সাপে কাটা এক শ্রমজীবী অসহায় নারীর প্রাণ রক্ষা করলেন উত্তর ২৪ পরগণার বাগদা ব্লকের তরুণ সমাজকর্মী তথা এলআইসি উপদেষ্টা সুজিত বিশ্বাস। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগে পাশে দাঁড়াল জয়ন্তী কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেড।
সংগ্রাম থেকে মানবিকতার পথ চলা

উত্তর ২৪ পরগণার সীমান্তবর্তী বাগদা ব্লকের তরুণ সমাজসেবীদের মধ্যে সুজিত বিশ্বাস এক পরিচিত নাম। পেশায় তিনি এলআইসি এজেন্ট হলেও তাঁর প্রকৃত পরিচয় সমাজসেবার মাধ্যমে। ছোটবেলার আর্থিক অনটন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়ে ওঠা এই তরুণ জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকেই শিখেছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাঠ। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাসহায়তা, কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা, সামাজিক সমস্যায় বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—সব ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। করোনা মহামারীর সময় পথকুকুরদের খাদ্যের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কর্মহীন মানুষের খাদ্য জোগান এবং বিভিন্ন রাজ্যে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্য—সব ক্ষেত্রেই তাঁর মানবিক উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়।
মুম্বাইয়ে ঘটল জীবন-মৃত্যুর লড়াই

সম্প্রতি কর্মসূত্রে মুম্বাইয়ে গিয়ে আবারও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তিনি। বাগদা ব্লকের চোয়াটিয়া পাঁচ মাইল গ্রামের এক শ্রমজীবী নারী মুম্বাইয়ের একটি নির্মাণস্থলে জয়ন্তী কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেডে রান্নার কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামী একই প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আচমকাই এক বিষধর সাপ ওই নারীকে কামড়ায়। কিন্তু ঘটনার পর দীর্ঘ সময় বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করা হয়নি। আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতার কারণে সময়মতো চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি—যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
মানবিকতায় বদলে গেল ভাগ্যের মোড়

রাত প্রায় আটটা নাগাদ এলআইসি সংক্রান্ত একটি প্রেজেন্টেশনের কাজে সেখানে উপস্থিত হন সুজিত বিশ্বাস। ঘটনাটি জানতে পেরে তিনি মুহূর্তের মধ্যে নিজের পেশাগত দায়িত্ব স্থগিত রেখে মানবিকতার দায়কে অগ্রাধিকার দেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগত খরচে ক্যাব ভাড়া করে দ্রুত আক্রান্ত নারীকে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ হাসপাতাল ও রাজীব গান্ধী মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান।প্রাথমিকভাবে চিকিৎসকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিলেও তাঁর দৃঢ় প্রশ্ন ও সচেতনতার ফলে প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা করা হয় এবং সর্পদংশনের সত্যতা নিশ্চিত হয়। পরবর্তীতে উপযুক্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাবে রোগীকে অন্য সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
অব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই

শিয়ন মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন পরিচালিত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও শুরু হয় দীর্ঘ অপেক্ষা। রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা শুরু না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমশ সংকটজনক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে চিকিৎসা শুরু করাতে সক্ষম হন সুজিত বিশ্বাস।চিকিৎসকরা জানান রোগীকে অবিলম্বে ১০ জার অ্যান্টি ভেনম প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু হাসপাতালের স্টকে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় নতুন করে বিপত্তি তৈরি হয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারটির পক্ষে ওষুধ সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে ভোররাতে অ্যান্টি ভেনম সংগ্রহ করে চিকিৎসা নিশ্চিত করেন তিনি। পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় গাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে অন্যান্য চিকিৎসা ব্যয় নিজ দায়িত্বে বহন করেন সুজিত বিশ্বাস।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই মানবিক অঙ্গীকার

মাত্র ১৮ বছর বয়সে মায়ের চিকিৎসার সময় অর্থাভাবে অসহায় হয়ে পড়ার স্মৃতি আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই সময় সমাজের কিছু মানুষের সহায়তায় মাকে সুস্থ করে ঘরে ফেরাতে পেরেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের দর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে—অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই মানবতার প্রকৃত পরিচয়।
সংস্থার সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ

জয়ন্তী কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেডের কর্ণধার ননি গোপাল মালাকার জানান, চিকিৎসার সমস্ত ব্যয় সংস্থা বহন করেছে এবং ভবিষ্যতেও কর্মীদের সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠান দায়বদ্ধ থাকবে। তিনি বলেন, সুজিত বিশ্বাসের তৎপরতা সমাজের কাছে এক বড় শিক্ষা—বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
উঠে এল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

এই ঘটনা শুধু একটি প্রাণরক্ষার কাহিনি নয়, বরং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছু ত্রুটিকেও সামনে এনে দিয়েছে। সর্পদংশনের চিকিৎসায় কেন এত বিলম্ব ঘটে? সরকারি হাসপাতালে কেন জরুরি অ্যান্টি ভেনমের পর্যাপ্ত মজুত থাকে না? সচেতন নাগরিক এগিয়ে না এলে কি আরও একটি জীবন নিভে যেত?
মানবতার জয়গান

এই ঘটনার শেষে সুজিত বিশ্বাসের একটাই উপলব্ধি—মানুষের জীবন পেশাগত দায়িত্বের চেয়েও মূল্যবান। তাঁর তৎপরতা, সাহস ও মানবিকতায় আজ নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন এক অসহায় নারী।এই কাহিনি শুধুমাত্র এক ব্যক্তির সাহসিকতার গল্প নয়—এটি সমাজকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতা এখনও আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। যখন দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতা একসঙ্গে কাজ করে, তখন মৃত্যুর অন্ধকারকেও হার মানিয়ে জীবনের আলো ফিরে আসে।




















Leave a Reply