ফলহারিণী কালীপুজোয় আজও অমলিন পান্নালাল ভট্টাচার্যের শ্যামাসংগীতের সাধনা

পারফেক্ট টাইম নিউজ ডেস্ক : ফলহারিণী কালীপুজোতেও বাঙালির অনুভবে জেগে ওঠেন পান্নালাল ভট্টাচার্যফলহারিণী কালীপুজোর পবিত্র উদযাপনের আধ্যাত্মিক পরিবেশেই বারবার ফিরে আসে এক কিংবদন্তি কণ্ঠ—তিনি পান্নালাল ভট্টাচার্য। বাংলা শ্যামাসংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে কালীপুজোর অনুভূতির সঙ্গে তাঁর নাম আজও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৬৬ সালে তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, তাঁর গাওয়া গানগুলি ততই এক অনন্য আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।কেবল সংগীত হিসেবে নয়, তাঁর কণ্ঠে শ্যামাসংগীত পরিণত হয়েছে ভক্তি ও আত্মসমর্পণের এক গভীর অভিব্যক্তিতে।

এই ফলহারিণী কালীপুজোতেও আজ ঘরে ঘরে বাজছে তাঁরই গাওয়া গান। এ যেন এক ধ্যানমগ্ন পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পান্নালাল ভট্টাচার্যের সৃষ্টিশীলতা ও জীবনদর্শনের পেছনে ছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক পরম্পরা। তাঁর সংগীতচর্চা কেবল মঞ্চ বা রেকর্ডিং স্টুডিওর সীমায় আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল অন্তর্লীন সাধনারই এক গভীর প্রকাশ। এই ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত ছিল শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের আধ্যাত্মিক প্রভাব।পারিবারিক দিক থেকেও তিনি এক সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহন করতেন। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের পরিবার ছিল সাধনা ও ভক্তির দীর্ঘ পরম্পরার ধারক।

সুরেন্দ্রনাথের কাকা ভাদুড়ি মহাশয়, যিনি পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ নামেও পরিচিত, ছিলেন এক বিশিষ্ট যোগী ও আধ্যাত্মিক সাধক। সারা বিশ্বে তিনি পরিচিত “The Levitating Saint” নামে। এই পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের রচিত ও সুরারোপিত পরমার্থসংগীত শুনে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই আধ্যাত্মিক পটভূমিই পান্নালাল ভট্টাচার্যের শ্যামাসংগীতকে শুধু সুর ও কথার সীমায় আবদ্ধ না রেখে এক গভীর সাধনামূলক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছিল। তাই তাঁর গানে ভক্তি, ব্যথা ও আত্মনিবেদন এক অনন্য সমন্বয়ে প্রকাশ পেয়েছে, যা আজও শ্রোতাদের আবেগে আন্দোলিত করে। এই ধারারই আরেক উজ্জ্বল নাম সাধক শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্যের মধ্যম অগ্রজ ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, যিনি একই ভক্তিসংগীত পরম্পরাকে সমৃদ্ধ করেছেন। এই প্রসঙ্গে পান্নালাল ভট্টাচার্যের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, বিশিষ্ট সুরকার প্রফুল্ল ভট্টাচার্যের দৌহিত্র ডঃ শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সাধক শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্যের শ্যামাসংগীত শুধুমাত্র গান নয়; এটি ছিল তাঁর অন্তর্লীন সাধনার প্রকাশ। এই ভাদুড়ি পরিবারে তন্ত্র ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার ছিল। সেই সঙ্গে এই পরিবারে ছিল গভীর পাণ্ডিত্য। শোনা যায় — এই কারণেই এঁরা বর্ধমান রাজ পরিবার থেকে ভট্টাচার্য উপাধি পান। এর সাথে সংযুক্ত হয়েছিল শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক প্রভাবও — গভীরভাবে। সেই কারণেই ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং পান্নালাল ভট্টাচার্য—উভয়েই শ্যামাসংগীতের ইতিহাসে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *