পারফেক্ট টাইম ওয়েব ডেস্ক : নীরবে, সজ্ঞানে, জীবনের শেষ প্রহর পর্যন্ত আপন আদর্শ ও নীতিবোধকে আঁকড়ে ধরে অবশেষে চিরনিদ্রার দেশে পাড়ি দিলেন ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষিকা, সর্বজনশ্রদ্ধেয়া মঞ্জু বিশ্বাস, সবার প্রিয় ‘লক্ষ্মী দিদিমনি’।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৮৩ বছর। গত ১৭ই আগস্ট, দুপুর প্রায় ১টা ২০ মিনিট নাগাদ ভবানীপুরে তাঁর ছোট ভাই মৃণাল বিশ্বাসের বাড়িতে সজ্ঞানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। আজীবন অকৃতদার মঞ্জু বিশ্বাস ছিলেন একনিষ্ঠ, সত্যধর্মী ও আদর্শবান এক নারী। শিক্ষাকে তিনি শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি, জীবনের ব্রত হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।

তৎকালীন সময়ে বি.এ. পাশ করা এই শিক্ষিকা ছিলেন অসাধারণ সুন্দর হাতের লেখার অধিকারিণী। তাঁর মমতাময়ী ব্যবহার, শৃঙ্খলাবোধ এবং শিক্ষাদানের আন্তরিকতা তাঁকে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের কাছে এক আলাদা মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সেই কারণেই এলাকাবাসীর কাছে তিনি আজও অমলিন, ‘লক্ষ্মী দিদিমনি’ নামে।

পাঁচ ভাই ও এক বোনের পরিবারে ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন মঞ্জু দেবী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছোট ভাই মৃণাল বিশ্বাসের ভবানীপুরের বাড়িতেই কাটিয়েছেন তিনি। সংসার জীবনের বাঁধনে আবদ্ধ না থেকেও পরিবার, শিক্ষা ও সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল গভীর এবং অকৃত্রিম। মঞ্জু বিশ্বাসের পরিবারও ছিল শিক্ষার ঐতিহ্যে উজ্জ্বল। তাঁর পিতা ঈশ্বর উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ভেন্নাবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

দেশভাগের পর এদেশে এসে তিনি বাগদার ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁরই পুত্র নির্মলেন্দু বিশ্বাস বাগদার আইসঘাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আর তাঁর কন্যা মঞ্জু বিশ্বাস নিজেও ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষাদানের মহান ব্রতে যুক্ত ছিলেন।

এই শিক্ষাব্রতের উত্তরাধিকার আজও বহমান। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ কুমার বিশ্বাস, সহকারী শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, ভবানীপুর পল্লীমঙ্গল বিদ্যাপীঠ (উচ্চ মাধ্যমিক) সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। মঞ্জু বিশ্বাসের প্রয়াণে শুধু একটি পরিবারের নয়, হারিয়ে গেল একটি সময়ের শিক্ষাদর্শ, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

তাঁর চলে যাওয়ায় ভবানীপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষা-অনুরাগী মানুষজনের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর স্বজন, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী ও নিকটজনেরা একটাই প্রার্থনা জানিয়েছেন, ‘লক্ষ্মী দিদিমনি’ তাঁরাদের দেশে ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন। তাঁর সরলতা, সত্যনিষ্ঠা ও শিক্ষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা আগামী প্রজন্মের কাছে হয়ে থাকুক এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। জানা গেছে, হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী তার পারলৌকিক ক্রিয়াদি করছেন তাঁর বড়ো ভাইপো শিক্ষক অনুপ কুমার বিশ্বাস।






















Leave a Reply