নীরেশ ভৌমিক : রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শনকে সামনে রেখে সমাজসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল গোবরডাঙার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা “আমার প্রয়াস”। সংস্থার উদ্যোগ ও আয়োজনে গত ৯ ও ১০ মে ২০২৬ (বঙ্গাব্দ ২৫ ও ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩), শনিবার ও রবিবার—দুইদিনব্যাপী পালিত হলো ১৬৫তম রবীন্দ্রজয়ন্তী ও আন্তর্জাতিক মাতৃদিবস।

এই দুইদিনের অনুষ্ঠান কেবল কবি-প্রণামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমাজকল্যাণ ও জনসচেতনতার এক বৃহৎ পরিসরে রূপ নিয়েছিল। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণায়ক বিনামূল্যে পরীক্ষা, থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে সচেতনতা শিবির, স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির, এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা।

স্বাস্থ্য পরিষেবায় সহযোগী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বারাসাত সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ও ইনচার্জ ডা: সুমিত্রা হালদার সহ তাঁর সহকারী কর্মীবৃন্দ। এছাড়াও মুকুন্দপুর আর. এন. টেগর হাসপাতালের চিকিৎসক ও সহকারীরা স্বাস্থ্য পরিষেবায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

দন্ত চিকিৎসা বিভাগে বিশেষ সহায়তা দেন ডা: অভ্রদ্বীপ মল্লিক। একদিকে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি যেমন ছিল বিস্তৃত, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে রবীন্দ্র-চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াসও ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কবি প্রণামের সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেয় মোট ১২টি সাংস্কৃতিক সংস্থা, যারা তাদের কলাকুশলী ও শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

সংস্থাগুলি হল—সঙ্গীত সপর্যা, নটরাজ কলাকেন্দ্র, গোবরডাঙা চিরন্তন, গীতিকুঞ্জ মিউজিক অ্যাকাডেমি, প্রভাতী আবৃত্তি পরিষদ, গোবরডাঙা নিক্কন, নৃত্যালয়, শিবাঙ্গন নৃত্যালয়, গোবরডাঙা অগ্নিবীণা নৃত্যালয়, জামদানী দর্পণ সঙ্গীত অ্যাকাডেমি, গোবরডাঙা পরম্পরা এবং ইছাপুর রূপায়ণ।অনুষ্ঠানে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতি যেমন ছিল উল্লেখযোগ্য, তেমনি ছিল অসংখ্য সাধারণ রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।

কবিগুরুর গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও নাট্য পরিবেশনার মাধ্যমে পুরো অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক সৃজনশীল সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।সংস্থার কর্ণধার সম্পাদক মাননীয় শ্রী অর্ণব কুমার দাস জানান, গোবরডাঙার চিকিৎসা পরিষেবা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত দুর্বল। সেই বাস্তবতার নিরিখে “আমার প্রয়াস”-এর এই আয়োজন একদিকে যেমন মানবসেবার পথ, অন্যদিকে তেমনি এক প্রতীকী প্রতিবাদ। তিনি আরও জানান, গত চার বছর ধরে একই ধারাবাহিকতায় বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বেচ্ছায় রক্তদান উৎসব আয়োজন করে চলেছে সংস্থাটি।

সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানানো হয়—গোবরডাঙা হাসপাতালকে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গরূপে চালু করতে হবে। এই দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সাধারণ মানুষও একবাক্যে জানিয়েছেন, এলাকার হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা গোবরডাঙা হাসপাতালকে দ্রুত কার্যকর করা হোক।

সামগ্রিকভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী ও মাতৃদিবস উপলক্ষে “আমার প্রয়াস”-এর এই উদ্যোগ গোবরডাঙায় মানবসেবার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকল—যেখানে কবি-প্রণাম মানে শুধু গান-আবৃত্তি নয়, বরং সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক বাস্তব প্রয়াস।


















Leave a Reply