মায়ের আঙুলে রক্ত! রানাঘাটের বুড়োমার পুজোয় ইতিহাসের সঙ্গে মিশেছে কিংবদন্তি

পারফেক্ট টাইম নিউজ সাহিত্য ডেস্ক : একদিন কৃষ্ণনগরের রাজসভায় প্রশ্ন উঠেছিল—মা কি শুধু মাটির প্রতিমাতেই বন্দি? মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র নাকি জানতে চেয়েছিলেন, ‘‘সব জায়গায় তো মায়ের মৃন্ময়ী রূপ দেখি, কোথায় গেলে চিন্ময়ী রূপ দেখতে পাব?’’

সেই প্রশ্নের উত্তরেই নাকি উচ্চারিত হয়েছিল একটি নাম—বুড়োমা।

তারপর? লোককথা বলে, রাজসভা থেকে তৎকালীন ব্রহ্মডাঙার পথে রওনা দিয়েছিলেন মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র। সেই পথের শেষেই নাকি অপেক্ষা করছিলেন তিনি—রানাঘাটের বুড়োমা। ইতিহাস সেখানে কতটা, আর লোকবিশ্বাস কতটা, তার হিসাব আজও মেলেনি। কিন্তু গল্পটি থেমেও যায়নি। বরং প্রজন্ম পেরিয়ে আরও গভীর হয়েছে।

আজও রানাঘাটের বুড়োমার পুজোয় তাই শুধু দেবীর আরাধনা হয় না। পাশাপাশি জেগে থাকে বহু পুরনো স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য আর একগুচ্ছ কিংবদন্তি।

শর্মা পরিবারের দাবি, এই পুজোর শুরু ১২৬২ সালে। চাঁচোল থেকে তৎকালীন ব্রহ্মডাঙায় এসে রামকুমার চক্রবর্তী এই মাতৃআরাধনার সূচনা করেছিলেন বলে পরিবারের বংশপরম্পরায় চলে আসা তথ্য। সেই দাবির পক্ষে এখনও কোনও লিখিত প্রামাণ্য নথি মেলেনি। তবু স্থানীয় স্মৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ ধারায় বুড়োমার পুজো আজও প্রাচীন পুজোগুলির অন্যতম বলেই পরিচিত।

তখন অবশ্য প্রতিমা ছিল না। ছিল ঘট। ঘটেই চলত পুজো।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে আরাধনার রূপ। এসেছে প্রতিমা। এসেছে রাজকীয় ঠাকুরদালান। কিন্তু পুরনো কিছু রীতি যেন সময়ের স্রোতকে অগ্রাহ্য করেই থেকে গিয়েছে।

পুজোর শুরুতে পাঁচটি বাড়িতে ভিক্ষে করে অর্থ সংগ্রহ করার প্রথা ছিল পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই। আজও সেই রীতি পালন করা হয়। যেন কয়েকশো বছর আগের কোনও সকাল হঠাৎ ফিরে আসে বর্তমানের মধ্যে।

কিন্তু বুড়োমার গল্পের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি অন্যত্র। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র।পরিবারের মুখে মুখে চলে আসা কিংবদন্তি বলছে, দেবীর চিন্ময়ী রূপ নিয়ে নিশ্চিত হতে মহারাজা নাকি প্রতিমার একটি আঙুল কেটে দিয়েছিলেন। তারপরই ঘটে সেই বিস্ময়—কাটা আঙুল থেকে নাকি বেরিয়ে এসেছিল রক্ত।

এক মুহূর্তে রাজসভা, যুক্তি, সংশয়—সবকিছু যেন হার মেনে যায় অলৌকিকতার কাছে। কিংবদন্তি বলে, ঘটনায় আতঙ্কিত মহারাজা দেবীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

সত্যিই কি এমন ঘটেছিল?

ইতিহাসের কাছে তার উত্তর নেই। এই ঘটনার কোনও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক নথিও এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে এই কাহিনি ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়, লোকবিশ্বাসেরই অংশ। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে সব গল্পের অস্তিত্ব নথির উপর নির্ভর করে না। কিছু গল্প বেঁচে থাকে মুখে মুখে, বিশ্বাসে, আচারে।

বুড়োমার এই গল্পটিও তেমনই। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে ঘিরে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বহু আখ্যান ছড়িয়ে রয়েছে। রানাঘাটের বুড়োমাকে ঘিরে এই কাহিনিও সেই লোকস্মৃতিরই একটি অংশ। তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাসটি পুজোর পরিচয়ের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে তাকে বাদ দিয়ে বুড়োমার গল্প সম্পূর্ণ হয় না।

আর আছে নবমীর কাদামাটি খেলা।

পুজোর আচার আর স্থানীয় লোকাচারের এই বিশেষ মেলবন্ধন আজও বুড়োমার পুজোকে আলাদা করে চেনায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও এক নীরব সাক্ষী—তালপাতার পুঁথি।পরিবারের দাবি, পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের অন্যতম ভিত্তি এই পুঁথি। যদিও বর্তমানে যে পুঁথিটি রয়েছে, সেটি মূল পুঁথি নয়। সময়ের ক্ষয়ে মূল পুঁথি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তার অনুলিপি সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেই অনুলিপিও কয়েক শতাব্দী পুরনো বলে পরিবারের দাবি।সৌরভ শর্মাচৌধুরী বলেন, ‘‘মূল পুঁথি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে যে পুঁথিটি রয়েছে, সেটিই আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংরক্ষণ করে আসছি।’’ পুঁথির বয়স নিয়ে অবশ্য আরও সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন পুরাণ গবেষক ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, শুধু পারিবারিক স্মৃতি বা প্রচলিত দাবি দিয়ে কোনও পুঁথির বয়স নির্ধারণ করা যায় না। লিপি, ভাষা এবং লেখার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলেই তার সময়কাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে তাঁর পর্যবেক্ষণ, বর্তমানে সংরক্ষিত পুঁথিটিও যথেষ্ট পুরনো—‘‘কয়েক শতাব্দীর তো বটেই।’’ বুড়োমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যের তালিকা এখানেই শেষ নয়।

পরিবারের দাবি, প্রথম প্রতিমা তৈরির সময় যে ছাঁচ ব্যবহার করা হয়েছিল, আজও সেই ছাঁচ অনুসরণ করেই তৈরি হয় প্রতিমা। রাজকীয় ঠাকুরদালান এসেছে পরে। কিন্তু তার বহু আগে থেকেই জ্বলে আসছে মাতৃআরাধনার প্রদীপ। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। ব্রহ্মডাঙার নাম বদলেছে, চারপাশ বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু কিছু গল্প বদলায়নি।

একটি পুরনো পুঁথি এখনও কথা বলে।একটি প্রাচীন রীতি এখনও পালিত হয়।

নবমীর কাদামাটিতে এখনও ফিরে আসে পুরনো দিনের ছায়া। আর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সেই প্রশ্ন—মৃন্ময়ী না চিন্ময়ী—আজও যেন ঘুরে বেড়ায় বুড়োমার পুজোমণ্ডপের বাতাসে।

বুড়োমা তাই শুধু একটি প্রতিমা নন, শুধু একটি পারিবারিক পুজোও নন। ইতিহাস যেখানে থেমে যায়, সেখানে লোকবিশ্বাস গল্প শুরু করে। আর সেই গল্পের ভিতর দিয়েই রানাঘাটে আজও বেঁচে থাকে বুড়োমা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *