সত্যপ্রদীপ পত্রিকা : আলোর ভিতরে অন্তরলোকের সন্ধান

পারফেক্ট টাইম নিউজ সাহিত্য ডেস্ক : মানুষের জীবনে বাইরের জগতের যত ব্যস্ততাই থাক, একসময় তাকে ফিরতেই হয় নিজের দিকে। আমি আসলে কে, আমার জীবনের প্রকৃত অর্থ কী, মানুষের সঙ্গে পরমসত্তার সম্পর্ক কোথায়, এই প্রশ্নগুলিই ধীরে ধীরে মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসার পথে নিয়ে যায়। সেই আত্মজিজ্ঞাসা, সাধনা ও অন্তরের আলোর কথাই ১৮৮১ থেকে বলে আসছে মহান যোগী ভাদুড়ী মহাশয়ের প্রবর্তিত অধ্যাত্ম-বিষয়ক পত্রিকা ‘সত্যপ্রদীপ’।

ভক্ত-অনুরাগীদের অনুভবে ভাদুড়ী মহাশয় ‘বহিরঙ্গে শিব, অন্তরঙ্গে বিষ্ণু’ নামে এক গভীর আধ্যাত্মিক ভাবমূর্তিতে উপস্থিত। তাঁর সাধনজীবনকে ঘিরে রয়েছে নানা স্মৃতি, অজস্র অলৌকিক ঘটনা, শ্রদ্ধা ও সাধন-পরম্পরা। পরমহংস যোগানন্দ তাঁর ‘Autobiography of a Yogi’ গ্রন্থের সপ্তম অধ্যায়ে নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী মহাশয়কে ‘The Levitating Saint’ হিসেবে সশ্রদ্ধ উল্লেখ করেছেন। সেই অধ্যায়ে তাঁর যোগসাধনা, প্রাণায়াম ও গভীর ধ্যানের কথাও উঠে এসেছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আজও সেই সাধনার ও ভাবনার প্রকাশ অব্যাহত। বর্তমান সম্পাদক ড. রবীন্দ্রনাথ করের সম্পাদনায় প্রকাশিত ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের দোলপূর্ণিমা সংখ্যাটি সেই দীর্ঘ সাধনা ও ভাবপরম্পরারই একটি নতুন অধ্যায়।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই দোলপূর্ণিমা সংখ্যায় রয়েছে পরমার্থ সঙ্গীত, কবিতা, ব্রহ্মচর্য, উপবাস, সাধকজীবন, যোগসাধনা, প্রকৃতির রহস্য, রবীন্দ্রভাবনা এবং উপনিষদ। বিষয় আলাদা হলেও প্রত্যেকটির ভিতরে যেন একটি সাধারণ সুর আছে। সেই সুরটি হল নিজেকে জানার চেষ্টা এবং নিজের ভিতরের অন্ধকারকে দূর করে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

এই সংখ্যায় মহর্ষি নগেন্দ্রনাথের ‘পরমার্থ সঙ্গীতাবলী’ থেকে গান দিয়ে শুরু হয়েছে ভাবনার যাত্রা। অন্যদিকে, সাধন কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপ্রকাশিত কবিতা ‘একটি প্রার্থনা’, অপরাজিতা দাসের ‘বিবেকশক্তি’, গীতা সিংহ ভারতীর ‘মোহন অমৃত নামটি তোমার’, অপর্ণা দাসের ‘উত্তরণ’ এবং রামচন্দ্র ধাড়ার ‘ভালোমন্দ’ কবিতাগুলি সংখ্যাটির সাহিত্যিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে।

আধ্যাত্মিক জীবন ও সাধনাকে ঘিরে রয়েছে শ্রীমৎ ধ্যানপ্রকাশ ব্রহ্মচারীর ‘অল্পকথায় ব্রহ্মচর্য’, শ্রীমৎ ভক্তিপ্রকাশ ব্রহ্মচারীর ‘মহাত্মা তৈলঙ্গস্বামী-শিষ্যা শঙ্করীমা’, এবং ড. প্রজ্ঞারঞ্জন দত্তর ‘মহাযোগী শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র’। একই সঙ্গে শিবানী ভট্টাচার্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন ‘শ্রীমৎ ধ্যানপ্রকাশ ব্রহ্মচারী : স্মরণের আলোয়’।

জীবনযাপন ও আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক নিয়ে অচিন্ত্যরতন দেবতীর্থের ‘সঠিক উপবাস আরোগ্যকারী’ এবং ড. সত্যনারায়ণ দাসের ‘প্রকৃতির রহস্য’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ এবং তাঁর পাঁচ শিষ্য’ মহর্ষিদেব প্রবর্তিত যোগ-ভক্তি মার্গের নিজস্ব সাধন-পরম্পরাকে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেয়।

সাহিত্য ও দর্শনের সংযোগও এই সংখ্যায় নজর কাড়ে। ড. বিশ্বব্রত মহাকুলের ‘নৈবেদ্য : রবীন্দ্র ভাবনায় অন্তর্যামী’ এবং বর্তমান সম্পাদক ড. রবীন্দ্রনাথ করের ‘উপনিষদ থেকে’ রচনাদুটি পাঠককে আত্মা, অন্তর্যামী, চৈতন্য ও পরমসত্তা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে ভাবতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, সাবিত্রী দত্তের ‘দোল উৎসব ও শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র’ উৎসবের সঙ্গে আধ্যাত্মিক অনুভবের সম্পর্কটিকেও সামনে আনে।

‘সত্যপ্রদীপ’-এর দীর্ঘ পথচলার দিকে তাকালে মনে হয়, এটি শুধু একটি পত্রিকার ইতিহাস নয়, একটি সাধনভাবনারও ইতিহাস। ভাদুড়ী মহাশয়ের সাধনচেতনা থেকে তাঁর মানসপুত্র ধ্যানপ্রকাশ ব্রহ্মচারীর ভাবধারা, ধ্যানপ্রকাশ ব্রহ্মচারীর ভাবধারা থেকে তাঁর ত্যাগী শিষ্য ভক্তিপ্রকাশ ব্রহ্মচারীর ভাবধারা আর সেখান থেকে বর্তমানের লেখক ও সম্পাদকদের কলমে যে ভাবপ্রবাহ এগিয়ে চলেছে, তার মধ্যেই পত্রিকাটির নিজস্ব আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার ধরা পড়ে।

সনাতন ধর্ম প্রচারিণী সভা ও শ্রীশ্রীনগেন্দ্র মঠ এবং নগেন্দ্র মিশনের এই ৫২ পৃষ্ঠার মুখপত্রটির অনুদান মূল্য মাত্র ১৫ টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *