গোবরডাঙ্গায় আকাঙ্ক্ষার আয়োজনে লোক আঙ্গিকে জাতীয় রংবাহারী উৎসব

নীরেশ ভৌমিক : উত্তর ২৪ পরগনার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে গোবরডাঙ্গার নাম উচ্চারিত হয় এক বিশেষ অভিধায় ‘নাটকের শহর’। দশকের পর দশক ধরে এই শহর মঞ্চকে শুধু শিল্পচর্চার স্থান হিসেবে নয়, সামাজিক চেতনাবোধের পরিসর হিসেবেও লালন করেছে।

সেই ঐতিহ্য, সেই কৃষ্টি ও লোকভিত্তিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই তরুণ তুর্কি নাট্যদল গোবরডাঙ্গা আকাঙ্ক্ষা নাট্য সংস্থার আয়োজনে ১৯, ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত হলো তিন দিনের “জাতীয় রংবাহারী উৎসব ২০২৬”। গোবরডাঙ্গা পৌর টাউন হল এই তিন দিন যেন পরিণত হয়েছিল লোকসংস্কৃতির এক উন্মুক্ত অঙ্গনে। এবারের মূল ভাবনা লোক সুরে, লোক আঙ্গিকে।

শুধু শিরোনামে নয়, প্রতিটি প্রযোজনা ও পর্বে ছিল তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে উৎসবের শুভ সূচনা করেন আসামের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তথা লেখক ও গবেষক ডক্টর অসীম বরা, অভিনব থিয়েটারের কর্ণধার ও পরিচালক দয়াল কৃষ্ণ নাথ; ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর বিশিষ্ট সাংবাদিক ও নাট্যসমালোচক অংশুমান ভৌমিক,

গোবরডাঙ্গা পৌরসভার পৌর প্রধান শঙ্কর দত্ত এবং গোবরডাঙ্গা নকসার কর্ণধার ও পরিচালক আশিস দাস। উদ্বোধনী পর্বে আকাঙ্ক্ষা নাট্য সংস্থার সদস্য-সদস্যাদের পরিবেশনায় নৃত্যানুষ্ঠান ‘আকাঙ্ক্ষিত মিলন’ লোকঐতিহ্যের আবহেই উৎসবের দরজা খুলে দেয়।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সম্মান প্রদান পর্ব। ‘সংস্কৃতি সাধক সম্মান’ প্রদান করা হয় ডক্টর অসীম বরাকে। ‘জাতীয় রংবাহারী সম্মান’ পান আসাম অভিনব থিয়েটারের কর্ণধার ও পরিচালক দয়াল কৃষ্ণ নাথ। কালিয়াগঞ্জ সুচেতা কলা কেন্দ্রের কর্ণধার ও পরিচালক তামস রঞ্জন ব্যানার্জী সম্মানিত হন ‘নাট্য যোদ্ধা’ সম্মানে। ‘আকাঙ্ক্ষা সম্মান’ তুলে দেওয়া হয় বিশিষ্ট সাংবাদিক ও নাট্যসমালোচক অংশুমান ভৌমিকের হাতে।

সম্মান মঞ্চে প্রতিফলিত হয়েছিল শিল্পচর্চার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা। প্রথম দিনের মঞ্চে ছিল দুই প্রযোজনা সন্তোষপুর অনুচিন্তন প্রযোজিত ও গৌরব দাস পরিচালিত ভারত রংমহোৎসব-খ্যাত পূর্ণদৈর্ঘ্যের নাটক ‘কিষান রাজ’ এবং গোবরডাঙ্গা আকাঙ্ক্ষা নাট্য সংস্থা প্রযোজিত, দয়াল কৃষ্ণ নাথ রচিত ও পরিচালিত প্রথম বাংলা নাটক ‘আমি রাজা’।

গ্রামীণ বাস্তবতা, কৃষিজীবনের সুর ও লোকভাবনার মেলবন্ধনে দুই নাটকই দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়। ২১ ফেব্রুয়ারী সকালে আয়োজিত জাতীয় আলোচনা চক্রে আলোচ্য বিষয় ছিল ভারতীয় নাট্যচর্চায় লোকসংস্কৃতির প্রভাব। বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আসাম অভিনব থিয়েটারের কর্ণধার ও পরিচালক দয়াল কৃষ্ণ নাথ,

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ডক্টর অসীম বরা, কালিয়াগঞ্জ সুচেতা কলা কেন্দ্রের কর্ণধার ও পরিচালক তাপস রঞ্জন ব্যানার্জী, বোলপুর নৃত্য নিকেতনের কর্ণধার ও পরিচালক অভিষেক দত্ত, বিশিষ্ট সাংবাদিক করুনা কৃষ্ণ নাথ এবং গোবরডাঙ্গার নাট্যায়নের কর্ণধার ও পরিচালক নারায়ন বিশ্বাস। তাদের আলোচনায় উঠে আসে লোকসংস্কৃতি কেবল নাটকের অলংকার নয়, ভারতীয় থিয়েটারের এক মৌলিক ভিত্তি।

দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হয় তিনটি নাটক কালিয়াগঞ্জ সুচেতা কলা কেন্দ্র প্রযোজিত ও তাপস রঞ্জন ব্যানার্জী পরিচালিত ‘বসন্ত শেষে’, আসাম অভিনব থিয়েটার প্রযোজিত ও দয়াল কৃষ্ণ নাথ রচিত,পরিচালিত ও অভিনীত নাটক ‘বিভ্রম’ এবং বোলপুর নৃত্যনিকেতন প্রযোজিত ও অভিষেক দত্ত পরিচালিত ‘টুরু লাভ’।

ভিন্ন ভিন্ন শৈলীতে উপস্থাপিত হলেও তিনটি প্রযোজনারই অন্তর্গত সুর ছিল লোকজ চেতনার ধারক। তৃতীয় দিনে পাঁচ দিনের বিদ্যালয়ভিত্তিক নাট্য কর্মশালার ফসল হিসেবে কামিনী কুমার গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রীরা পরিবেশন করে ‘শেকড়’, পরিচালনায় গোবরডাঙ্গা আকাঙ্ক্ষা নাট্য সংস্থার পরিচালক অমিত কুমার সিকদার। এরপর ছিল দক্ষিণেশ্বর সংকেত প্রযোজিত ও প্রিয়াঙ্ক রায় পরিচালিত ‘রূপাই সাজু কথা’ এবং অন্তিম প্রযোজনা লিভিং থিয়েটার আসাম প্রযোজিত ও প্রানজ্জ্বল বোরাগোছেন পরিচালিত ‘সুকুরমণি’। সমাপনী পর্বে লোকসুরে তালে নৃত্য ও সংগীতানুষ্ঠান যেন তিন দিনের শিল্পসম্ভারকে পূর্ণতা দেয়। তিন দিনে মোট আটটি নাটক মঞ্চস্থ হয় প্রতিটি প্রযোজনায় লোকঐতিহ্যের স্পষ্ট ছাপ।

গোবরডাঙ্গা আকাঙ্ক্ষা নাট্য সংস্থার সম্পাদিকা তনুশ্রী দেবনাথ (দত্ত) বলেন, “আমাদের লক্ষ্য বাংলার লোকসংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে আরও শক্তভাবে তুলে ধরা। সংস্কৃতি ও কৃষ্টি যেন শিল্পের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। ”ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের আর্থিক সহায়তায় আয়োজিত এই উৎসব কেবল নাট্যমঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিন দিন জুড়ে দর্শকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি প্রদর্শনীতেই ভরপুর আসন, করতালির উচ্ছ্বাস এবং আন্তরিক অংশগ্রহণ যেন প্রমাণ করে দিল নাটকের শহর গোবরডাঙ্গায় লোকঐতিহ্যের টান আজও অমলিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *