নীরেশ ভৌমিক : গোবরডাঙা নাবিক নাট্যমের উদ্যোগে দিনভর রাখি উৎসব ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হল রাখি বন্ধন উৎসব। গোবরডাঙা নাবিক নাট্যমের উদ্যোগে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে সারাদিন জুড়ে ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের এক সুন্দর আবহ। সংস্কৃতি ও মানবিকতার মেলবন্ধনে এই আয়োজন হয়ে উঠেছিল এক আন্তরিক ও হৃদয়স্পর্শী উৎসব।রাখি বন্ধনের মূল উদ্দেশ্য শুধু ভাই-বোনের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করা নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধনকে সুদৃঢ় করা। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে গোবরডাঙা নাবিক নাট্যমের সদস্যরা এদিন সাধারণ মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।সকাল ৮টা থেকেই শুরু হয় রাখি পরানোর কর্মসূচি। পথচলতি সাধারণ মানুষ, পরিচিত-অপরিচিত মানুষ—সকলের হাতেই আন্তরিকতার সঙ্গে রাখি পরিয়ে দেওয়া হয়। শিশু থেকে প্রবীণ, তরুণ থেকে সাধারণ পথচারী—সকলেই এই সুন্দর উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। কারও হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিময় হয় হাসি, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। অচেনা মানুষও মুহূর্তের মধ্যে যেন আপন হয়ে ওঠেন এই ভালোবাসার বন্ধনে।রাখির সুতোয় বাঁধা ছিল এক গভীর সামাজিক বার্তা—আমরা সবাই একে অপরের পাশে, আমরা সবাই একে অপরের আপন। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক পরিচয়ের বিভেদ ভুলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তোলাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। সকালের এই কর্মসূচি তাই নিছক রাখি পরানোর অনুষ্ঠান না হয়ে হয়ে উঠেছিল সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।সারাদিনের এই উৎসবের দ্বিতীয় পর্বে ছিল সংস্কৃতির বিশেষ আয়োজন। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে গোবরডাঙা নাবিক নাট্যমের মহড়া কক্ষে শুরু হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিল্পী, নাট্যকর্মী ও সংগঠনের সদস্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময়। এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন সৌরজাতি অধিকারী, অদিতি সাধুখাঁ, সোনালী দাস, শর্মিষ্ঠা সাধুখাঁ , মামন চৌধুরী, লক্ষণ বিশ্বাস, অনু বিশ্বাস, আখি বিশ্বাস, নমিতা বিশ্বাস, জয়ব্রত দাস, অস্মিতা দত্ত, এবং ইমন মাইম সেন্টারের সৃজা হাওলাদার। এছাড়াও এই দিন উপস্থিত ছিলেন দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্রী প্রদীপ কুমার সাহা। তাছাড়া উপস্থিত ছিলেন দলের সভাপতি শ্রাবণী সাহা, সহ-সভাপতি শর্বানী অধিকারী, সুব্রত কর্মকার, অশোক বিশ্বাস এবং এলাকার বহু বিশিষ্টজনেরা।সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, আবৃত্তি, নৃত্যসহ বিভিন্ন পরিবেশনা দর্শকদের আনন্দ দেয়। শিল্পীদের আন্তরিক পরিবেশনা এবং তাঁদের সৃজনশীল উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানস্থল মুখরিত হয়ে ওঠে। একদিকে যেমন ছিল বিনোদনের আনন্দ, অন্যদিকে প্রতিটি পরিবেশনার মধ্য দিয়েই ফুটে উঠেছিল আমাদের সংস্কৃতি, মানবিকতা ও পারস্পরিক বন্ধনের কথা।গোবরডাঙা নাবিক নাট্যম দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজের মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির আলো পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে চলেছে। সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল এবারের রাখি বন্ধন উৎসব। নাট্যচর্চার পাশাপাশি সমাজের বৃহত্তর মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। নাবিক নাট্যমের নাট্যনির্দেশক জীবন অধিকারী বলেন রাখি বন্ধনের এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সম্পর্কের জন্য সবসময় রক্তের সম্পর্কের প্রয়োজন হয় না। ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সুতোতেই মানুষ মানুষের সঙ্গে তৈরি করতে পারে এক😪 অটুট বন্ধন। সেই বন্ধনের প্রতীক হিসেবেই রাখির ছোট্ট সুতো বহু মানুষের হৃদয়কে একসূত্রে বেঁধে দেওয়া আমাদের মূল উদ্দেশ্য।সকাল থেকে সাধারণ মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়া এবং সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনভর চলে উৎসবের আবহ। গোবরডাঙা নাবিক নাট্যমের এই আয়োজন শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি; বরং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক সুন্দর প্রয়াস হয়ে উঠেছে।শেষ পর্যন্ত একটাই বার্তা যেন প্রতিধ্বনিত হয়েছে এই উৎসবের প্রতিটি মুহূর্তে—“রাখির বন্ধন হোক সকলের,ভালোবাসার বন্ধন হোক অটুট।ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষেগড়ে উঠুক সম্প্রীতির সুন্দর সেতু।”এই সুন্দর ভাবনা ও মানবিক চেতনাকে সঙ্গে নিয়েই আগামী দিনেও গোবরডাঙা নাবিক নাট্যমের সাংস্কৃতিক পথচলা আরও সমৃদ্ধ হবে—এই প্রত্যাশাই রইল।





















Leave a Reply