পারফেক্ট টাইম সাহিত্য ডেস্ক : ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, যাঁর কণ্ঠ আজও অমর। তাঁর কণ্ঠ এখনও বাঙালির আবেগের সঙ্গে কথা বলে। তাই এত বছর পরেও তাঁর কণ্ঠে শুধু গান ফিরে আসে না—ফিরে আসে বাঙালির আবেগ তো বটেই, মুগ্ধতাও।
১০ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনের আগে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে মনে পড়ে বাংলা গানের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল অধ্যায়—যেখানে সুর, সাহিত্য, ভক্তি, আবেগ একসঙ্গে মিশে ছিল।
এই কণ্ঠের প্রথম স্বীকৃতি এসেছিল শৈশবেই। উত্তরপাড়া রাজবাড়িতে একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে সাত-আট বছরের ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁকে পুরস্কার হিসেবে দিয়েছিলেন পাঁচ টাকা। সেই পাঁচ টাকা বালকটির কাছে হয়ে উঠেছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।
বহু বছর পরে সেই কণ্ঠই পেয়েছিল ‘স্বর্ণকণ্ঠ’-র স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। বিধানচন্দ্র ছিলেন ধনঞ্জয়ের গানের গভীর অনুরাগী। দেখা হলেই তাঁর প্রিয় ‘গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি, কাশী কাঞ্চি কে বা চায়, কালী কালী কালী বলে’ গানটি গাওয়ার অনুরোধ করতেন। জীবনের শেষদিকে ধনঞ্জয়ের গান শুনতে তিনি তাঁকে বাড়িতে ডেকেও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু টাইফয়েডে আক্রান্ত ছেলেকে রেখে সেই ডাকে সাড়া দিতে পারেননি ধনঞ্জয়। বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যু সেই অপূর্ণ সাক্ষাতের আক্ষেপ তাঁর মনে গেঁথে দিয়েছিল চিরদিনের জন্য।

ধনঞ্জয়ের সংগীতের ভিত তৈরি হয়েছিল এক গভীর আধ্যাত্মিক ও সংগীতময় পরিবারে। তাঁর পিতা সুরেন্দ্রনাথ ছিলেন সেতার ও এসরাজে দক্ষ। সংগীতজ্ঞ। এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল সুরেন্দ্রনাথের কাকা ভাদুড়ী মহাশয়ের আধ্যাত্মিক পরম্পরা; বৈষ্ণবীয় ভক্তি, তন্ত্রসাধনা ও যোগসাধনা। তাই তাঁর ভক্তিগীতি ও শ্যামাসংগীতে সুরের সঙ্গে মিশে থাকত গভীর আত্মনিবেদনের আবহ।
রবীন্দ্রনাথের গানের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতেও তাঁর কণ্ঠের নিজস্ব ব্যঞ্জনা স্পষ্ট।
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের অগ্রজ সুরকার প্রফুল্ল ভট্টাচার্যের সুরে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া ‘বাসরের দীপ আর আকাশের তারাগুলি’, ‘হৃদয়ে মোর রক্ত ঝরে’, ‘ফুল গো তোমারে ছুঁয়ে’র মতো গান স্মরণীয় হয়ে আছে। সুধীন দাশগুপ্ত, সলিল চৌধুরী, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্রের মতো সুরকারদের সুরেও তাঁর কণ্ঠ পেয়েছিল নিজস্ব দীপ্তি। গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাও তাঁর কণ্ঠে পেয়েছিল আলাদা ব্যঞ্জনা।
আর অনুজ পান্নালাল ভট্টাচার্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল রক্ত ও সংগীত—দুই বন্ধনে বাঁধা। ‘অপার সংসার নাহি পারাপার’ সেই সম্পর্কের এক অনন্য স্মারক।

আধুনিক বাংলা গান, চলচ্চিত্রের গান, নজরুলগীতি, ভক্তিগীতি ও শ্যামাসংগীত—বহু ধারায় নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন ধনঞ্জয়। মুম্বইয়ের হিন্দি সংগীতজগত থেকেও আমন্ত্রণ এসেছিল, কিন্তু বাংলার এই সংগীতভূমি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হতে চাননি।
ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের অগ্রজ, সুরকার প্রফুল্ল ভট্টাচার্যের দৌহিত্র ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য মনে করেন তাঁর মেজ দাদু ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের অমরত্ব নিহিত আছে তাঁর ভক্তিগীতিতে, তাঁর আত্মনিবেদনের চূড়ান্তে। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, “মেজ দাদুর কণ্ঠে শুধু সুর ছিল না, ছিল গভীর অনুভব। বিশেষ করে ভক্তিগীতিতে তাঁর আত্মনিবেদনের যে সুর, তা আজও শ্রোতাদের স্পর্শ করে। আমাদের পারিবারিক সংগীত ও আধ্যাত্মিক পরম্পরার এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছিল তাঁর শিল্পীসত্তায়।”
তাই তাঁর জন্মদিনের আগে তাঁকে স্মরণ করা শুধু একজন গায়ককে স্মরণ করা নয়; বাংলা গানের স্বর্ণযুগকে ফিরে দেখা।























Leave a Reply