বাল্যবিধবা সদুর হাত ধরে সূচনা, ৩৩১ বছরেও অম্লান ‘সদু-বাউনি’র পুজো

পারফেক্ট টাইম নিউজ, রানাঘাট : শিউলির গন্ধমাখা শরতে ঢাকের শব্দে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে পাড়া। শুরু হয়েছে দেবীবরণের প্রস্তুতি। আর এই প্রেক্ষিতেই রানাঘাট দে চৌধুরীপাড়ায় ধূপের ধোঁয়া আর প্রদীপের আলোয় যেন ফিরে আসছে কয়েক শতাব্দী আগের এক অধ্যায়। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে কোনও রাজা বা জমিদার নন, রয়েছেন এক বাল্যবিধবা। তাঁর নাম সদু। নিজের জীবনের প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে যিনি দেবী আরাধনার আলো জ্বালিয়েছিলেন তাঁর জন্মভিটেয়। সেই আলো আজও নিভে যায়নি। ৩৩১ বছর পরেও নদিয়ার রানাঘাটের দে চৌধুরীপাড়ায় ঐতিহ্যের গরিমায় অমলিন ‘সদু-বাউনি’র দুর্গাপুজো।

আজকের রানাঘাট, একসময় যার নাম ছিল ব্রহ্মডাঙ্গা, সেই প্রাচীন জনপদের ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর জন্মকথা। স্থানীয় বাসিন্দা শীলা ঘোষের কথায়, পাড়ার মেয়ে সদুই ছিলেন এই আরাধনার সূচনাকারী। বাল্যবিধবা হওয়ার পর কালনায় তাঁর শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক পুজো নিজের জন্মভিটে ব্রহ্মডাঙ্গায় ফিরিয়ে আনেন তিনি। সেখানেই শুরু হয় নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে দেবী আরাধনা। সময়ের স্রোতে সেই পুজো আর একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে এলাকার দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য।

পুজোর নামের মধ্যেও মিশে রয়েছে লোকমুখে বয়ে চলা ইতিহাস। স্থানীয় প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘ব্রাহ্মণী’ শব্দ থেকেই এসেছে ‘বাউনি’। সদুর নামের সঙ্গে সেই শব্দ জুড়ে কালক্রমে পরিচিতি পায় ‘সদু-বাউনি’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই নামের সঙ্গে বেঁচে রয়েছে পুজোর সূচনালগ্নের স্মৃতি। সদুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ও প্রাচীন মণ্ডপ আজও রয়েছে। বর্তমানে ঘোষ পরিবারের তত্ত্বাবধানে থাকা সেই বাড়ি ও মণ্ডপ যত্নে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

একসময় ব্রাহ্মণ পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগেই পারিবারিকভাবে পরিচালিত হত এই পুজো। কিন্তু ১৯৭০ সালের পর ব্রাহ্মণদের পক্ষে পুজো চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সেই সংকটের সময়ে ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব নেন প্রয়াত যতীন্দ্রনাথ নন্দী। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৭১ সাল থেকে পারিবারিক পুজো বারোয়ারির রূপ নেয়। তারপর থেকে পাড়ার মানুষই সম্মিলিতভাবে এই আরাধনার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। এক পরিবারের উঠোনে শুরু হওয়া পুজো ক্রমে হয়ে উঠেছে গোটা এলাকার আবেগ ও গর্বের প্রতীক।

সময়ের সঙ্গে দুর্গাপুজোর আয়োজন বদলেছে, এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু ‘সদু-বাউনি’র পুজোয় আজও অটুট সাবেকি আচার। ষষ্ঠীতে দেবীর ভোগে থাকে কলাইয়ের ডাল। দশমীর বিশেষ আয়োজন পান্তা ভাত, কচুর শাক ও চালতার টক। পুজোর তিন দিন ধরে আখ, কুমড়ো, কলা ও বিভিন্ন ফল বলির রীতিও আজও বজায় রয়েছে। এই বিশেষ রীতিগুলিই প্রাচীন পুজোটিকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

তবে প্রতিমার সাজে এসেছে পরিবর্তন। একসময় একচালা প্রতিমায় থাকত মাটির সাবেকি সাজ। এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ডাকের সাজ। বদল এসেছে বিসর্জনের রীতিতেও। একসময় কাঁধে করে দেবীকে নিয়ে যাওয়া হত বিসর্জনের পথে। এখন সেই জায়গা নিয়েছে ট্রাক কিংবা ভ্যান। বাহন বদলেছে, আয়োজন বদলেছে, কিন্তু দেবীকে বিদায় জানানোর আবেগে কোনও পরিবর্তন আসেনি।

এবার ৩৩১তম বর্ষ। বিশেষ এই উপলক্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে মণ্ডপসজ্জা থেকে উদ্বোধন—সব ক্ষেত্রেই নতুনত্বের পরিকল্পনা করছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী ১৩ অক্টোবর, তৃতীয়ার দিন উদ্বোধন হবে ঐতিহাসিক এই পুজোর।

তবে ‘সদু-বাউনি’র কাহিনি কেবল একটি প্রাচীন পুজোর বয়সের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নারীশক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এক গভীর ব্যাখ্যাও। পুরাণ গবেষক ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, এক বাল্যবিধবার হাত ধরে শুরু হওয়া ‘সদু-বাউনি’র এই মাতৃ আরাধনাকে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, দেখা যেতে পারে এক নারীর অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ হিসেবে তো বটেই, শক্তিতত্ত্ব ও তান্ত্রিক উপাসনার এক স্থানীয় প্রকাশ হিসেবেও।

শরৎ আসে, শরৎ যায়। প্রজন্ম বদলায় কিন্তু রানাঘাটের এই পাড়ায় দেবীর আগমনের সঙ্গে ফিরে ফিরে আসে সদুর গল্প। একসময় ব্রহ্মডাঙ্গার মাটিতে যে আরাধনার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন তিনি, ৩৩১ বছর পরেও সেই আলো বহন করে চলেছেন এলাকার মানুষ। বিশ্বাসের গভীরে এ এক অনন্য উত্তরাধিকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *