পারফেক্ট টাইম ওয়েব ডেস্ক : শরতের নীল আকাশ, মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা, ঢাকের ছন্দময় বোল আর উমার আগমনের প্রতীক্ষায় আপামর বাঙালির হৃদয়ে যখন উৎসবের আবহ, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই শারদীয় আনন্দে এক অনন্য মাত্রা যোগ করল ভবানীপুর পল্লীমঙ্গল বিদ্যাপীঠ (উচ্চমাধ্যমিক)।

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, পুজোর ছুটির প্রাক্কালে বিদ্যালয়ের পরিচালনায় আয়োজিত হলো এক বর্ণাঢ্য ও মনোমুগ্ধকর ‘আগমনী’ অনুষ্ঠান। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল প্রতিভা, শিল্পসুষমা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিক উদ্যোগে এদিনের অনুষ্ঠান পরিণত হয়েছিল এক টুকরো সাংস্কৃতিক মহোৎসবে।

আবৃত্তি, নৃত্য, মূকাভিনয়, সংগীত এবং দেবদেবীর মনোরম সাজসজ্জায় সজ্জিত শিক্ষার্থীদের বর্ণময় উপস্থাপনায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এদিন হয়ে উঠেছিল শারদীয় আবেগের এক প্রাণবন্ত মিলনক্ষেত্র। বিশেষত, দেবী দুর্গার অকালবোধনকে কেন্দ্র করে নির্মিত সমগ্র অনুষ্ঠানটি দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

পৌরাণিক আখ্যান, শিল্পের নান্দনিকতা এবং শিক্ষার্থীদের সাবলীল অভিনয়ের মেলবন্ধনে মঞ্চে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল বাংলার চিরায়ত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।দেবদেবীর রূপে শিক্ষার্থীরা, মঞ্চে পৌরাণিক আখ্যানের জীবন্ত উপস্থাপনাএদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, পার্বতী, কালিকা এবং অন্যান্য পৌরাণিক চরিত্রে শিক্ষার্থীদের অপরূপ সাজসজ্জা ও মঞ্চাভিনয়।

প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভূমিকায় যথাসাধ্য দক্ষতার পরিচয় দিয়ে দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে। দেবী দুর্গার ভূমিকায় সপ্তম শ্রেণির রিয়া বিশ্বাস, দেবী লক্ষ্মীর ভূমিকায় সপ্তম শ্রেণির বর্ষা দাস এবং দেবী সরস্বতীর ভূমিকায় সপ্তম শ্রেণির নেহা বিশ্বাস মঞ্চকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

সিদ্ধিদাতা গণেশের ভূমিকায় অষ্টম শ্রেণির সপ্তর্ষি মণ্ডল, কার্তিকের ভূমিকায় ষষ্ঠ শ্রেণির শুভঙ্কর এবং মহিষাসুরের ভূমিকায় সপ্তম শ্রেণির ঈশানের অভিনয় অনুষ্ঠানে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।এ ছাড়াও রামচন্দ্রের ভূমিকায় দশম শ্রেণির উদয় বিশ্বাস, লক্ষ্মণের ভূমিকায় দশম শ্রেণির কনিষ্ক বাইন, সীতার ভূমিকায় ষষ্ঠ শ্রেণির উদিতা এবং হনুমানের ভূমিকায় ষষ্ঠ শ্রেণির উদিত দর্শকদের সামনে রামায়ণের পৌরাণিক চরিত্রগুলিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে।

পার্বতীর ভূমিকায় সপ্তম শ্রেণির ইন্দ্রাক্ষী বিশ্বাস, দেবী কালিকার ভূমিকায় সপ্তম শ্রেণির দীপিকা বিশ্বাস এবং শিবঠাকুরের ভূমিকায় ষষ্ঠ শ্রেণির রাজের উপস্থিতিও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ।শিক্ষার্থীদের এই নান্দনিক উপস্থাপনা কেবল দর্শনীয় পরিবেশই সৃষ্টি করেনি, বরং ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শিক্ষকদের সৃজনশীল ভাবনায় অনুষ্ঠানের অনন্য রূপায়ণএকটি সুন্দর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের নেপথ্যে থাকে পরিকল্পনা, নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা এবং নিরলস পরিশ্রম। এদিনের ‘আগমনী’ অনুষ্ঠানটির ভাবনা ও রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক অনুপ কুমার বিশ্বাস ও অমিত ব্যানার্জী।

তাঁদের পরিকল্পনা ও সৃজনশীল পরিচালনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিভা যেন যথার্থ প্রকাশের সুযোগ পায়। অনুষ্ঠানে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাসুদেব চক্রবর্তীর রামায়ণ কেন্দ্রিক ভাষ্যপাঠ। পৌরাণিক কাহিনির প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক আবেদনকে আরও গভীর করে তোলেন।বিদ্যালয়ের মঞ্চ ও তার চারপাশের সাজসজ্জায় ফুটে উঠেছিল শরতের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য।

কাশফুলের আবহ এবং একজোড়া ঢাকের ছন্দময় বাদন মিলিয়ে গোটা পরিবেশে সৃষ্টি হয়েছিল আগমনী সুরের এক আবেগঘন অনুরণন। এই নান্দনিক পরিবেশ নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।বিদ্যালয়ের আঙিনায় শারদীয় সম্প্রীতি ও আনন্দের মেলবন্ধনএদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক-অভিভাবিকা এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন এবং তাঁদের প্রতিভা ও উপস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়।শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ, সৃজনশীল মনন গঠন এবং সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটানোও তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

ভবানীপুর পল্লীমঙ্গল বিদ্যাপীঠের এই ‘আগমনী’ অনুষ্ঠান যেন সেই শিক্ষাদর্শেরই এক সুন্দর প্রতিফলন। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর থেকে বিদ্যালয়ে পুজোর ছুটি শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এদিনের অনুষ্ঠান ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মনে শারদীয় আনন্দের এক বিশেষ স্মৃতি উপহার দিল।

সব মিলিয়ে, ভবানীপুর পল্লীমঙ্গল বিদ্যাপীঠের এই ‘আগমনী’ অনুষ্ঠান ছিল কেবল একটি বিদ্যালয় ভিত্তিক সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; বরং বাঙালির শারদোৎসব, পৌরাণিক ঐতিহ্য, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কর্মনিষ্ঠার এক আন্তরিক সম্মিলন।

সময়ের স্রোতে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে, মঞ্চের আলো নিভে যাবে, শুরু হবে পুজোর ছুটি—কিন্তু শরতের স্নিগ্ধ আবহে দেবীবন্দনার এই মনোমুগ্ধকর মুহূর্তগুলি অংশগ্রহণকারী ও দর্শকদের স্মৃতির মণিকোঠায় দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে। আর সেখানে জল ছবির মত হয়তো থেকেই যাবে স্কুলের গুনীপ্রধান শিক্ষক বাসুদেব চক্রবর্তী ও বাংলা বিভাগের উদার মনা শিক্ষক অনুপ বিশ্বাসের নাম।





















Leave a Reply