নীরেশ ভৌমিক : রূপান্তরের নতুন প্রোজোজনা ‘ইনোচি’ এ এক ভবিষ্যতের আয়নায় মানুষের খোঁজ। ২০৩৬ সালের কল্পিত সময়কে পটভূমি করে নির্মিত নাটক “ইনোচি” আসলে শুধু ভবিষ্যতের গল্প নয়, এটি আমাদের বর্তমান সময়েরও এক গভীর প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ভেতর মানুষ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, মানবিক সম্পর্ক, শিল্পচর্চা এবং বাস্তব জীবনের আনন্দ কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে—এই প্রশ্নগুলোকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নাটকীয় ভঙ্গিতে তুলে ধরেছে প্রযোজনাটি। নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে ইনোচি—এক প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্মের প্রতিনিধি। তার বিশ্বাস, মানুষ জটিল, বিরক্তিকর; বরং এআই অনেক সহজ ও নিরপেক্ষ।

কিন্তু এই বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন ভবতোষ কাকু—এক পুরোনো দিনের মানুষ, যিনি মানবিক শিক্ষা, কল্পনা ও সৃজনশীলতার পক্ষে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত থেকেই নাটকের মূল নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ইনোচির মানসিক ভাঙনের দৃশ্যগুলি। যখন এআই তাকে জানায় যে ভবিষ্যতে শিল্পীরও প্রয়োজন থাকবে না, তখন বাস্তব ও ভার্চুয়াল জগতের সীমা ভেঙে পড়তে শুরু করে। মঞ্চে যন্ত্রমানব ও গেমের চরিত্রের আবির্ভাব সেই মানসিক বিভ্রান্তিকে দৃশ্যমান করে তোলে—যা দর্শকদের জন্য এক অভিনব ও চিন্তাজাগানিয়া অভিজ্ঞতা।

নাটকের দ্বিতীয় অংশে ভবতোষ কাকুর স্মৃতিচারণ এক অন্য আবহ তৈরি করে। মাঠে খেলা, বন্ধুত্ব, পুজোর আনন্দ, ঘুড়ি ওড়ানো—এইসব সহজ, মানবিক মুহূর্তগুলো যেন ইনোচির মনোজগতে নতুন জানালা খুলে দেয়। এই অংশে নাটকটি কেবল গল্প বলেই থেমে থাকে না, বরং দর্শকদেরও নিজের শৈশব ও বাস্তব জীবনের আনন্দের কথা মনে করিয়ে দেয়।

নির্দেশনায় শুভ বিশ্বাস অত্যন্ত সংবেদনশীল মঞ্চভাষা ব্যবহার করেছেন। সহ-নির্দেশনায় দেবদত্ত কর্মকার। সৌম্য হরি-র আলো পরিকল্পনা ও স্বরূপ দেবনাথ-এর মঞ্চভাবনা নাটকের ভবিষ্যতধর্মী পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।চন্দন দেবনাথ-এর আবহ সংগীত এবং সুবীর নারায়ন দাস-এর ব্যবহার্য সামগ্রীর পরিকল্পনা প্রযোজনাকে পূর্ণতা দিয়েছে।অভিনয়ের ক্ষেত্রে দলগত উপস্থিতি বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।

মনোদীপ সরকার, চন্দ্রিল দেবনাথ, আকাশ বিশ্বাস, নবীন দাস, শুভদীপ দেবনাথ, রক্তিমা দাস, রিমা দাস, মৌসুমী মুখার্জি, সুমনা সিংহ, তাপস সিংহ, তৃষাণ সিংহ, অদ্রিজা সিংহ, অভিক দাঁ, জুঁই রানী পাল, অরিঞ্জয় দাঁ এবং দেবদত্ত কর্মকার—সকলের সম্মিলিত অভিনয় নাটকটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।নাটকের শেষ দৃশ্যটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। ঘুড়ির উড়ান এখানে শুধু একটি দৃশ্য নয়—এটি হয়ে ওঠে মুক্তির প্রতীক, যেখানে প্রযুক্তির দমবন্ধ করা পর্দা ভেদ করে মানুষ আবার ফিরে পায় আকাশ, সম্পর্ক এবং নিজের সৃজনশীল সত্তাকে।

সব মিলিয়ে “ইনোচি” একটি সময়োপযোগী, ভাবনাসমৃদ্ধ এবং মানবিক নাট্যপ্রযোজনা। প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এআই যত উন্নতই হোক, মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও সৃজনশীলতার জায়গা কখনোই পুরোপুরি দখল করতে পারে না।এই নাটক দর্শককে শুধু বিনোদনই দেয় না, বরং ভাবতে বাধ্য করে—আমরা কি সত্যিই প্রযুক্তির মালিক, নাকি অজান্তেই তার বন্দি হয়ে পড়ছি?
















Leave a Reply