পারফেক্ট টাইম ওয়েব ডেস্ক : সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের পরিষেবা প্রদান থেকে শুরু করে পঞ্চায়েতের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ—সবকিছু নিয়েই বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতে জমে উঠছে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভই যেন ক্রমশ প্রকাশ্যে বিস্ফোরণের রূপ নিচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ে একাংশ সাধারণ মানুষের বিক্ষোভকে ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের একটাই দাবি—প্রধানের পদত্যাগের পর এবার উপপ্রধানকেও হয় যথাযথভাবে কাজ করতে হবে, নতুবা পদত্যাগ করতে হবে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই পঞ্চায়েতের একাধিক পরিষেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন ও নাগরিক পরিষেবার বিষয়গুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে সার্টিফিকেট, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক পরিষেবা পেতে সাধারণ মানুষকে বারবার পঞ্চায়েত কার্যালয়ে এসে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সঞ্জিত সর্দার পদত্যাগ করার পর সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে বলে দাবি বিক্ষোভকারীদের। এবার উপপ্রধান সুনীল পালের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, পঞ্চায়েত পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দ্রুত পরিষেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের সমস্যার সমাধান যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে সম্ভব না হয়, তাহলে তাঁদের দায়িত্বে থাকার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সার্টিফিকেটের জন্য বারবার পঞ্চায়েতে—ক্ষোভ সাধারণ মানুষের
বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতের পরিষেবা নিয়ে মানুষের ক্ষোভ যে কেবল রাজনৈতিক অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা এদিন পঞ্চায়েত কার্যালয়ে আসা সাধারণ মানুষের বক্তব্যেও উঠে আসে।
স্টাইপেন্ডের টাকা পাওয়ার জন্য ইনকাম সার্টিফিকেট নিতে দেহালদা থেকে পঞ্চায়েতে এসেছিলেন পড়ুয়া রাজু সর্দার। একই কাজে এসেছিলেন সন্তু তরফদার। বাকসা থেকে সার্টিফিকেটের কাজে এসেছিলেন বাবলু মণ্ডল ও পূজা মণ্ডল। তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যেই উঠে আসে পরিষেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা ও হয়রানির অভিযোগ।

বয়রা থেকে সিএএ সংক্রান্ত কাজে পঞ্চায়েতের সহযোগিতা চাইতে এসেছিলেন বাসন্তী সিংহ রায়। অন্যদিকে বাগদার বাসন্তী মণ্ডলের অভিযোগ, পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য তাঁকে বারবার আসতে হচ্ছে, অথচ প্রধান কিংবা উপপ্রধান—কারও দেখা মিলছে না।
দেহালদার মিঠু বিশ্বাসের অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক। তাঁর বক্তব্য, মেয়ের বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পঞ্চায়েত সার্টিফিকেট নিতে তিনি ৭-৮ দিন ধরে পঞ্চায়েতে আসছেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।

উপপ্রধানের দেখা না মেলায় ক্ষোভ আরও বাড়ে
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য ছিল, তাঁরা জানতে এসেছিলেন উপপ্রধান সুনীল পাল বর্তমানে পঞ্চায়েতের কাজ কীভাবে পরিচালনা করছেন এবং সাধারণ মানুষের পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নির্ধারিত দিনে পঞ্চায়েত কার্যালয়ে এসে উপপ্রধানের দেখা না পাওয়ায় তাঁদের ক্ষোভ আরও বাড়ে। পঞ্চায়েত চত্বরে একসময় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়।
উপপ্রধান সুনীল পাল অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে জানান, তাঁর দল আপাতত তাঁর পদত্যাগের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাইছে না। আলোচনা সাপেক্ষেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতের মোট ২৭ জন সদস্যের মধ্যে ২২ জন তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য—তাঁদের মতামতও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি জানান।

‘পঞ্চায়েতে অচলাবস্থা চলছে’, দাবি বিজেপির
বাগদা মণ্ডল-১-এর বিজেপি সহ-সভাপতি গণেশ বিশ্বাসের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এর দ্রুত অবসান হওয়া প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্য, প্রধান সঞ্জিত সর্দার পদত্যাগ করেছেন। এরপর উপপ্রধান সুনীল পাল দায়িত্ব পেলেও সাধারণ মানুষ যথাযথ পরিষেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠছে। তাই তিনি হয় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করুন, নতুবা পদত্যাগ করুন—এটাই সাধারণ মানুষের দাবি।
একই সুর বাগদা মণ্ডল-১-এর বিজেপি সভাপতি দিবাকর তরফদারের গলাতেও। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল পরিচালিত বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে এলাকার সাধারণ মানুষ যথাযথ পরিষেবা পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা বিডিও-র কাছেও অভিযোগ জানিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

দিবাকর তরফদারের বক্তব্য, “কাজ করলে ঠিকঠাকভাবে করতে হবে, না হলে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। মানুষকে এভাবে হয়রানির মধ্যে রাখা যায় না।”
পঞ্চায়েতের সামগ্রিক পরিকাঠামোর সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এমনকী পঞ্চায়েতের শৌচাগারটিও ব্যবহারের অনুপযোগী বলে দাবি করেন।

প্রশ্ন এখন একটাই—পরিষেবা কবে স্বাভাবিক হবে?
সব মিলিয়ে বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। একদিকে প্রধানের পদত্যাগ, অন্যদিকে উপপ্রধানকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ—তারই মাঝে সার্টিফিকেট ও সরকারি পরিষেবার জন্য পঞ্চায়েতে এসে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সাধারণ মানুষ।
পঞ্চায়েত ব্যবস্থা মূলত মানুষের দোরগোড়ায় প্রশাসনিক পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেখানে পরিষেবা পেতে যদি সাধারণ মানুষকে বারবার কার্যালয়ে ছুটতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
তবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের বক্তব্যের পাশাপাশি পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যও এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে বাস্তবে কোথায় সমস্যা, কেন পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং তার সমাধানের পথ কী—তা স্পষ্ট হওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।

বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েতের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—রাজনৈতিক টানাপোড়েন নয়, দ্রুত স্বাভাবিক হোক পঞ্চায়েতের পরিষেবা; বন্ধ হোক হয়রানি, প্রতিষ্ঠিত হোক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
আর উপপ্রধান সুনীল পালকে ঘিরে তৈরি হওয়া বর্তমান পরিস্থিতিরও দ্রুত নিষ্পত্তি চান তাঁরা। কারণ, নির্ধারিত দিনে উপপ্রধানের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে ক্ষোভ নতুন করে দানা বাঁধছে, তা আগামী দিনে আরও বড় জনরোষের রূপ নেবে কি না—সেদিকেই এখন নজর বাগদা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার মানুষের।




















Leave a Reply